বিটকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের শরয়ী বিধান

বিটকয়েন (Bitcoin), ইথেরিয়াম (Ethereum), বিএনবি (BNB)-সহ যাবতীয় ডিজিটাল বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ বিনিয়োগ করা, এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা কিংবা ক্রয়-বিক্রয়ে অংশ নেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।

হারাম ও অবৈধ হওয়ার কারণসমূহ

১. প্রকৃত মুদ্রা ও মালের বৈশিষ্ট্যের অনুপস্থিতি (عدم المالیة والتقوم):

শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী কোনো বস্তুকে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা বা সম্পদ (مال متقوم) হতে হলে তার বাস্তব উপযোগিতা এবং সংরক্ষণযোগ্যতা (التمول والادخار) থাকতে হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বিমূর্ত ও কেবল ইন্টারনেট কোডিং-নির্ভর ভার্চুয়াল মুদ্রা। এর নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই।

২. জবাবদিহিতা ও ক্ষতিপূরণের অভাব (انعدام الضمان):

দেশীয় কাগজের নোট বা প্রচলিত মুদ্রার পেছনে রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে। মুদ্রা অচল হলে রাষ্ট্র থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব। পক্ষান্তরে ক্রিপ্টোকারেন্সির কোনো নির্দিষ্ট অভিভাবক, মালিক বা সার্বভৌম নিয়ন্ত্রক নেই। সিস্টেম হ্যাক হলে বা সার্ভার বন্ধ হলে কোনো আদালতে ক্ষতিপূরণ (ضمان) দাবির পথ থাকে না।

৩. মারাত্মক অস্পষ্টতা ও ঝুঁকি (الغرر الفاحش):

এর উৎস, পরিচালনা এবং অ্যালগরিদম অজ্ঞাত ও অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। হাদিস শরীফে অজ্ঞাত ও কৃত্রিম ঝুঁকির লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৪. জুয়া ও ফটকাবাজির মাধ্যম (القمار والميسر):

বিটকয়েনের দরবৃদ্ধি বা পতন কোনো উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না; বরং নিছক স্পেকুলেশন ও অনুমানের ওপর বাজি ধরে লেনদেন হয়। এক পক্ষের চরম ক্ষতিই এখানে অন্য পক্ষের আকস্মিক লাভ, যা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে জুয়ার হুবহু রূপান্তর।

৫. অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস ও পাপাচারের পথ (أكل أموال الناس بالباطل):

বাস্তব পণ্য হস্তান্তর ব্যতীত কেবল মূল্যবৃদ্ধির আশায় ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মতো অর্থ খাটানো বাতুল উপায়ে অর্থ উপার্জনের শামিল। তদুপরি, এই নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক অর্থপাচার, মাদক ও চোরাচালানের মতো অপরাধের লেনদেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এতে সহায়তা করাও অন্যায়ের পরোক্ষ সহযোগিতা।

১. পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের তাহকীক

১. ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা ও সুদের নিষেধাজ্ঞা

نص: ﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ [سورة البقرة: ২৭৫] অনুবাদ: “অথচ আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”

তাহকীক ও প্রয়োগ: শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী যে লেনদেনে শরয়ী মাপকাঠিতে কোনো বাস্তব পণ্য বা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘মাল’ (مال متقوم) থাকে না, কেবল কাগুজে অংক ও রূপক বিনিময়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের ফাঁদ তৈরি হয়, তা ‘বায়’ (বৈধ ব্যবসা)-এর অন্তর্ভুক্ত থাকে না; বরং সুদের (রিস্ক ও অবৈধ মুনাফা) সাদৃশ্যে রূপ নেয়। ক্রিপ্টোকারেন্সির ট্রেডিংয়ে পণ্যের কোনো বাস্তব হস্তান্তর (تسليم ও تسلم) ঘটে না।

২. জুয়া ও সর্বপ্রকার নাপাক উপার্জনের নিষেধাজ্ঞা

نص: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾ [سورة المائدة: ৯০] অনুবাদ: “হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক তীরসমূহ—এসবই শয়তানের অপবিত্র কর্ম। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”

তাহকীক ও প্রয়োগ: আয়াতে বর্ণিত ‘আল-মাইসির’ (المَيْسِرُ)-এর অর্থ জুয়া। বিটকয়েন ইত্যাদির দরবৃদ্ধি বা দরপতন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং অনুমানের ওপর বাজি ধরে একপক্ষের সর্বস্বান্ত হওয়া ও অন্যপক্ষের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করে, যা সরাসরি ‘ক্বিমার’ ও ‘মাইসির’-এর হুকুমকে টেনে আনে।

৩. অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ নিষিদ্ধকরণ

نص: ﴿وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ﴾ [سورة البقرة: ১৮৮ / النساء: ২৯] অনুবাদ: “আর তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায় ও অবৈধ পন্থায় গ্রাস করো না।”

তাহকীক ও প্রয়োগ: ইমাম বাগভী (রহ.) তাঁর তাফসীর মা‘আলিমুত তানযীল-এ (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫০) ব্যাখ্যা করেছেন:«أَيْ بِالْحَرَامِ يَعْنِي بِالرِّبَا وَالْقِمَارِ وَالْغَصْبِ وَالسَّرِقَةِ» (অর্থাৎ হারাম উপায়ে—সুদ, জুয়া, জবরদখল ও চুরির মাধ্যমে)। যে মুদ্রার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই এবং কৃত্রিমভাবে বাজার প্রভাবিত করে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘বাতিল পন্থায় মাল ভক্ষণ’-এর নামান্তর।

৪. পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতার নিষেধাজ্ঞা

نص: ﴿وَلا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾ [سورة المائدة: ২] অনুবাদ: “আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।”

তাহকীক ও প্রয়োগ: বিটকয়েন ব্যবস্থা ডার্কওয়েব, অর্থপাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অজ্ঞাত আর্থিক অপরাধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর নেটওয়ার্কে অর্থ বিনিয়োগ বা মাইনিংয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করা প্রকারান্তরে অন্যায়ের পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার শামিল।

২. হাদিস শরীফের দলীলসমূহের তাহকীক

১. মাদক ও জুয়া উম্মতের জন্য হারাম হওয়া

نص: عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَى أُمَّتِي الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ...» (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫১, হাদিস নং ৬৫১১/৬৫৫৬; সহীহ সানাদ)

তাহকীক ও প্রয়োগ: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুনির্দিষ্টভাবে জুয়াকে তাঁর উম্মতের ওপর নিষিদ্ধ করেছেন। ক্রিপ্টো মার্কেটের স্পেকুলেশন ও ডে-ট্রেডিং জুয়ার শরয়ী সংজ্ঞাকে শতভাগ প্রতিফলিত করে।

২. ‘বাইয়ে হাছাহ’ ও ‘বাইয়ে গারার’ (অনিশ্চিত ক্রয়-বিক্রয়) নিষেধ

نص: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: «نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ، وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ» (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫১৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭৪০৫; সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী, হাদিস নং ১০৩৯০; সহীহ)

তাহকীক ও প্রয়োগ:

বাইয়ে হাছাহ (بيع الحصاة): জাহেলী যুগে পাথর ছুঁড়ে দিয়ে পণ্য নির্ধারণ করা হতো, যা ছিল পণ্য অজ্ঞাত ও অনিশ্চিত রাখার প্রতীক।

বাইয়ে গারার (بيع الغرر): এমন লেনদেন যার অস্তিত্ব, প্রাপ্তি বা পরিণতি অনিশ্চিত (مستور العاقبة)। বিটকয়েনের কোডিং বা মালিকানার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের আইনে নিশ্চিত নয়; যেকোনো টেকনিক্যাল বা সার্ভার বিপর্যয়ে এর অস্তিত্ব নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, যা সুস্পষ্ট ‘গারারে ফাহেশ’ (মারাত্মক অস্পষ্টতা ও ঝুঁকি)।

৩. সন্দেহযুক্ত বিষয় পরিহারের মূলনীতি

نص: عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: «الْحَلَالُ بَيِّنٌ، وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشَبَّهَاتٌ لَا يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ...» (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২০৫১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৯৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নং ২৭৬২)

তাহকীক ও প্রয়োগ: ক্রিপ্টোকারেন্সির অন্তর্নিহিত স্বরূপ ও লেনদেনের বৈধতা যেখানে সুস্পষ্টভাবে সংশয়পূর্ণ এবং ক্ষতির দিকে ধাবিত করে, সেখানে একজন মুমিনের দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষার তাগিদে তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা অপরিহার্য।

৩. ফিকহী ইবারত ও মূলনীতির তাহকীক

১. ক্বিমার বা জুয়ার ফিকহী সংজ্ঞা ও বিটকয়েনের ওপর প্রয়োগ

ইবারত: العلامة ابن عابدين الشامي رحمہ اللہ লিখেন: «لِأَنَّ الْقِمَارَ مِنَ الْقَمَرِ الَّذِي يَزْدَادُ تَارَةً وَيَنْقُصُ أُخْرَى، وَسُمِّيَ الْقِمَارُ قِمَارًا؛ لِأَنَّ كُلَّ وَاحِدٍ مِنَ الْقِمَارَيْنِ مِمَّنْ يَجُوزُ أَنْ يَذْهَبَ مَالُهُ إِلَى صَاحِبِهِ، وَيَجُوزُ أَنْ يَسْتَفِيدَ مَالَ صَاحِبِهِ، وَهُوَ حَرَامٌ بِالنَّصِّ» (রদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার / ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৫৭৭, যাকারিয়া প্রকাশনী)

তাহকীক ও মূলনীতি: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী জুয়াকে ‘ক্বিমার’ এজন্য বলা হয় যে চাঁদের মতো এর লাভ-ক্ষতি হ্রাস-বৃদ্ধি পায়। এর মূল শর্ত হলো: লেনদেনের উভয় পক্ষের যেকোনো একজনের অর্থ অপরজনের কাছে চলে যাওয়ার সমান ঝুঁকি থাকে এবং এই লাভ কোনো উৎপাদনশীল বিনিময়ের ফল নয়। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিয়োগে সম্পদ কেবল হাতবদল হয়—একজনের ক্ষতিই অন্যের লাভ।

২. মালের শরয়ী সত্ত্বা ও দামান (المَالَية والضمان)

ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: মুদ্রা বা সম্পদ হতে হলে তার ভেতর ‘ইসতিমওয়াল’ (সংরক্ষণযোগ্যতা ও উপযোগিতা) থাকতে হবে।

দেশীয় কারেন্সি বাতিল হলে তা রাষ্ট্রীয় সনদের বিপরীতে পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু বিটকয়েনে ‘যামিন’ বা দায়বদ্ধ কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় কোনো বিবাদ বা ক্ষতি হলে শরয়ী আদালতে ক্ষতিপূরণ (ضمان) আদায়ের কোনো পথ থাকে না। সুতরাং এটি কেবল কাল্পনিক হিসাব (مال اعتباري وهمي), প্রকৃত শরয়ী মাল নয়।

 

দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া নম্বর ১৫৫০৬৮-এ বর্ণিত কুরআন, হাদিস এবং ফিকহে হানাফীর এ সকল সুস্পষ্ট দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিটকয়েন ও সমজাতীয় মুদ্রায় কেনাবেচা বা বিনিযোগের যাবতীয় প্রক্রিয়া শরীয়তসম্মত নয়।